ইউএনও ভবনে হামলা, সব আসামির অব্যাহতি চেয়ে পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন – Naf TV

ইউএনও ভবনে হামলা, সব আসামির অব্যাহতি চেয়ে পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন

বরিশালে ইউএনওর ওপর হামলার চেষ্টা এবং তা প্রতিরোধে আনসারদের নিক্ষিপ্ত গুলি এবং পরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহসহ ২৮ আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাননি তদন্ত কর্মকর্তা ।

আদালতে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এমনটাই উল্লেখ করছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। প্রতিবেদনে ঘটনাটি সত্য বলে উল্লেখ করা হলেও মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তারা এর সঙ্গে জড়িত ছিল না বলেছে পুলিশ।

সাক্ষ্যপ্রমাণে তাদের বিরুদ্ধে কিছুই পাওয়া যায়নি বলা হয়েছে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। তবে ভবিষ্যতে এ ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত করা গেলে পুনরায় মামলাটি পূনঃরুজ্জীবিত করা হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা।

বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসামিদের অব্যাহতি প্রদানের আবেদন জানিয়ে গত ৬ ডিসেম্বর এ চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেন কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) লোকমান হোসেন।

বিষয়টি এতোদিন গোপন থাকলেও গত ১ জানুয়ারি একটি লাইভ অনুষ্ঠানে সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর দেওয়া বক্তব্যের মাধ্যমে জানাজানি হয়। ওই বক্তব্যে হামলার ঘটনায় তিনিসহ দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দোষ থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন মেয়র সাদিক।

২০২১ সালের ১৮ আগস্ট বরিশাল সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে ব্যানার অপসারণকে কেন্দ্র করে বরিশাল সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সাথে বাদানুবাদ হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনিবুর রহমানের। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনে দায়িত্বরতরা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর গুলি চালায়। এতে আহত হওয়ার দাবি ওঠে মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহসহ প্রায় ৩০ জনের।

পরবর্তীতে বিষয়টি মুহূর্তের মধ্যে নগরীতে ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুদ্ধ নেতাকর্মীরা উপজেলা পরিষদ চত্বরে জমায়েত হয়ে বিক্ষোভ করলে পুলিশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় পাল্টা প্রতিরোধেরও চেষ্টা চালায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

এ ঘটনায় পরে ইউএনও মুনিবুর রহমান বাদী হয়ে মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহকে প্রধান আসামি করে ২৮ জনের নাম উল্লেখসহ ৭০-৮০ জনকে অজ্ঞাত করে কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। দায়ের করা মামলার সব আসামিই আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। হামলা গুলিবর্ষণের এ ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় ওঠে।

ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বিবৃতি পর্যন্ত দেওয়া হয়। থানায় দায়ের হয় দুটি মামলা। এর একটির বাদী হন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনিবুর রহমান এবং অপরটির বাদী হয় পুলিশ।

এর মধ্যে মুনিবুর বাদী হয়ে দায়ের হওয়া মামলায় দেয়া হলো চূড়ান্ত প্রতিবেদন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত পুলিশ যে চূড়ান্ত প্রতিবেদনই দেবে সেটা আগে থেকেই অনেকটা নিশ্চিত ছিল। কেননা ১৮ আগস্টের ওই ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে সমঝোতা বৈঠক হয় প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে।

গত ২২ আগস্ট অনুষ্ঠিত ওই সমঝোতা বৈঠক শেষে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট একেএম জাহাঙ্গীর সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, পুরো বিষয়টিই ছিল ভুল বোঝাবুঝি। বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল আহসান বাদলের সরকারি বাসভবনে তারই মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত ওই সমঝোতা বৈঠকে সিভিল প্রশাসন এবং পুলিশ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ।

বৈঠক শেষে অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর বলেন, এখন থেকে আমরা সবাই একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করব। আমাদের মধ্যে আর কোনো দূরত্ব নেই।

সিটি মেয়রসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ইউএনও-পুলিশের দায়ের করা দুটি মামলা তাৎক্ষণিকভাবে গৃহীত হলেও একই ঘটনায় ইউএনও-পুলিশের বিরুদ্ধে আদালতে দাখিল হওয়া দুটি মামলার আবেদনের বিষয়ে অবশ্য গত প্রায় সাড়ে ৪ মাসেও পাওয়া যায়নি চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত। ১৮ আগস্টের ওই ঘটনায় ইউএনও এবং পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পাল্টা দুটি মামলার আবেদন আদালতে দাখিল করেছিলেন এখানকার আওয়ামী লীগ নেতারা। সে দুটিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ না করে তদন্তের জন্য পাঠানো হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে। এখন পর্যন্ত ওই তদন্ত রিপোর্ট জমা হয়নি আদালতে। ফলে এসব আবেদন মামলা হিসেবে গৃহীত হবে কিনা সে বিষয়টিও রয়ে গেছে প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থায়।

ইউএনওর মামলায় আদালতে দাখিল হওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে এ মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় কোতোয়ালি মডেল থানার তৎকালীন পরিদর্শক (অপারেশন) আনোয়ার হোসেনকে। আনোয়ার হোসেন কাউনিয়া থানায় বদলি হওয়ার পর মামলার তদন্তভার পান কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) লোকমান হোসেন।

আদালতে দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তদন্ত কর্মকর্তা বিষয়টি পর্যালোচনা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মামলা সংক্রান্ত আলোচনা করেন। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঘটনাস্থলের খসরা মানচিত্র, সূচিপত্র ও চৌহদ্দি পর্যালোচনা ও তদন্ত করে মামলার আসামি বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসান মাহামুদ বাবু, জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রাজীব হোসেন খান, সহ সভাপতি সাজ্জাদ সেরনিয়াবাত, আতিকউল্লাহ মুনিমসহ নামধারী ২৮ আসামির বিরুদ্ধে বাদী মুনিবুর রহমানের আনা অভিযোগের সত্যতা পায়নি।

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ইউএনওর অভিযোগের সত্যতা সাক্ষ্য প্রমাণে মেলেনি তাই আসামিদের এ মামলার দায় থেকে অব্যহতি প্রদানের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা প্রার্থনা জানান আদালতে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামিদের শনাক্ত করা সম্ভব হলে মামলাটি পুনঃজীবিত করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে লোকমান হোসেন বলেন, ইউএনও মহোদয়ের দায়ের করা মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। কারো পক্ষপাতিত্ব নয়, তদন্তে যেটা উঠে এসেছে সেটাই উল্লেখ করা হয়েছে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে।

দাখিল হওয়া এ চূড়ান্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে মামলার বাদী তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনিবুর রহমান বলেন, পুলিশের দাখিল করা এ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে আমি আপাতত কোনো মন্তব্য করতে চাইছি না। পুরো বিষয়টি সম্পর্কে আমি যেমন জানি তেমনি আপনারাও সব জানেন। এখানে আমার মন্তব্য করা না করায় কিছুই আসবে যাবে না।